গর্ভপাত

সব গর্ভধারণ নয় মাস(৪০সপ্তাহ)স্থায়ী হয় না এবং সব ক্ষেত্রে শিশুর জন্ম হয় না৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে গর্ভ নিজে নিজেই নষ্ট হয়ে যায়, একে বলা হয় গর্ভপাত বা স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভপাত৷ সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৬ সপ্তাহের আগেই গর্ভপাত হয়ে যায়৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশন করে গর্ভ নষ্ট করে দেওয়া হয়, একে বলা হয় আবিষ্ট(ঘটানো) গর্ভপাত৷

গর্ভপাত বা স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভপাত

প্রতি ১০০টি গর্ভাধানে দশ থেকে কুড়িটি ক্ষেত্রে গর্ভপাত হয়৷ বাচ্চার বাঁচার আশা না থাকলে গর্ভস্থ ভ্রুণ নষ্ট হয়ে গিয়ে গর্ভপাত হয়৷ বেশির ভাগ গর্ভপাত গর্ভধারনের প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যে হয়৷
 
গর্ভপাতের কারণ কি? এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে সাধারণ কারণ হল নিষিক্ত ডিমটির কোনো ত্রুটি৷ যদি ডিমটি বড় হয় ও বৃদ্ধি পায়, তবে সাংঘাতিক অস্বাভাবিকতা, যেমন, বিকৃত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বা কোনো কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ না থাকা অবস্থা নিয়ে শিশুর জন্ম হতে পারে৷ অতএব, বলা যেতে পারে, গর্ভপাত হল অস্বাভাবিক জন্ম ঠেকাবার জন্য প্রকৃতির একটি পদ্ধতি৷

যদি কোনো মহিলার কোনো গুরুতর অসুখ থাকে, যেমন, ম্যালেরিয়া বা সিফিলিস, খুব জোরে পড়ে যাওয়া, অথবা তাঁর জননাঙ্গের ত্রুটি বা সমস্যা থাকে, তাহলেও গর্ভপাত হতে পারে৷ কিছু ক্ষেত্রে নিষিক্ত ডিমটি গর্ভাশয়ের বদলে অন্য কোথাও স্থাপিত হওয়ার ফলে (সাধারণত ডিম্বনালীতে) গর্ভপাত হয়৷ এই ধরণের গর্ভাধানের ক্ষেত্রে সবসময়েই গর্ভপাত হয়ে থাকে, এবং এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে৷



গর্ভপাতের লক্ষণ

গর্ভপাতের দুটি প্রধান লক্ষণ হল- যোনি থেকে রক্তপাত এবং তলপেটে ব্যথা৷ শুরুতে রক্তপাত অল্প থাকে, কিন্তু ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং তারপরেই রক্তপিন্ড বার হতে থাকে৷ রক্তপাত ও ব্যথা দুটি লক্ষণই প্রায় খুব বেশী মাসিক ঋতুস্রাবের মত, বিশেষত, যদি গোড়ার দিকেই গর্ভপাত হয়৷ এই কারণে কখন গর্ভপাত হল, এটা বলা মুশকিল হয়, বিশেষত, যদি গর্ভাধান হয়েছে এমন সন্দেহই না হয়৷



“পূর্ণ” গর্ভপাত

একটি গর্ভপাতকে তখনই সম্পূর্ণ বলা হবে, যখন যোনিপথে বাড়তে থাকা ভ্রুণের সমস্ত তন্তু ও ফুলটি বেরিয়ে আসবে৷ সম্পূর্ণ গর্ভপাতের ক্ষেত্রে কয়েকদিনের মধ্যেই রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যাবে৷ এরকম ক্ষেত্রে মহিলাটির বিশ্রাম নেওয়া উচিত ও ভারী জিনিস তোলা উচিত নয়৷ তাঁকে নিজেকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং যৌন সংসর্গ এড়িয়ে চলতে হবে৷

অপূর্ণ গর্ভপাত

যদি গর্ভের ভেতর ভ্রুণের কিছু অংশ বা ফুল রয়ে যায়, তবে গর্ভপাত অসম্পূর্ণ থেকে যাবে৷ গর্ভাধানের দশম ও কুড়িতম সপ্তাহের মাঝামাঝি গর্ভপাত হলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবার সম্ভাবনা থাকে৷ এক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ চলতেই থাকে ও গর্ভে রয়ে যাওয়া মৃত তন্তুগুলি থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে, যা জ্বর ও পেটে ব্যথার কারণ হয়৷ গর্ভপাত অসম্পূর্ণ থাকলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব হাসপাতাল বা চিকিত্সাকেন্দ্রে গিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিত্সাকর্মীকে দিয়ে গর্ভ পুরোপুরি পরিষ্কার করাতে হবে৷ যদি অসম্পূর্ণ গর্ভপাত সংক্রমিত হয়, তবে তা থেকে জ্বর ও জননাঙ্গগুলিতে ব্যথা হতে পারে, যা সারে না৷ সংক্রমণের চিকিত্সা না হলে, তা থেকে ডিম্বনালীতে ক্ষত হতে পারে, য়া কোনো মহিলার বন্ধ্যাত্ব আনতে পারে৷ গর্ভপাতের পরে একজন মহিলার যদি সংক্রমণের কোনো লক্ষণ দেখা দেয, তবে অবিলম্বে তাঁকে ডাক্তারী পরীক্ষা করাতে হবে৷

ক্রমাগত গর্ভপাত : কিছু মহিলার বার বার গর্ভপাত হতে থাকে৷ গর্ভাধানের পরপরই একটি বা দুটি গর্ভপাত হলে, তাঁকে ভরসা দিতে হবে৷ কিন্তু গর্ভাবস্থার পরের দিকে তৃতীয় বা চতুর্থ বার গর্ভপাত হলে, তাঁকে এর কারণ খোঁজার জন্য ডাক্তারী পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে উত্সাহ দিতে হবে৷
আবিষ্ট গর্ভপাত : নিজে থেকে হওয়া গর্ভপাতকে “স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভপাত”ও বলা হয়ে থাকে৷ কোনো কোনো সময় একজন মহিলা “আবিষ্ট গর্ভপাতে”র দ্বারা গর্ভস্থ ভ্রুণ নষ্ট করেন৷ এই পদ্ধতিটি সাধারণত গর্ভাধান শুরুর তিন মাসের মধ্যে প্রয়োগ করা হয়৷ মহিলাটিকে ব্যথা কমাবার ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়, তারপর চিকিত্সক যোনিপথে যন্ত্র ঢুকিয়ে, তার সাহায্যে গর্ভ পরিষ্কার করে দেন৷ এই অপারেশন করতে সাধারণত ১৫ মিনিট লাগে৷ যদি পরিষ্কার পরিবেশে যথাযথ যন্ত্রপাতির সাহায্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির দ্বারা করানো হয়, তবে গর্ভপাত বিপজ্জনক নয়৷

যদি অসুরক্ষিত পদ্ধতিতে এই গর্ভপাত করানো হয়, তবে মহিলাটির জননাঙ্গগুলিতে সাংঘাতিক সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে৷

যদি কোনো কারণে কোনো মহিলার আবিষ্ট গর্ভপাত করা হয় এবং তাঁর এই লক্ষণগুলির যে কোনো একটি থাকে - জ্বর বা কাঁপুনি, পেটে ব্যথা, খিঁচুনি বা পিঠে ব্যথা, যোনি যেকে অবিরাম রক্তক্ষরণ বা যোনি থেকে খুব বেশি পরিমাণ দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব নিঃসরণ অথবা স্বাভাবিক ঋতুস্রাব হতে দেরী হওয়া(৬সপ্তাহ বা তার বেশি), তবে অবিলম্বে তাঁকে চিকিত্সার জন্য হাসপাতালে যেতে হবে, দেরী করা মানে মৃত্যু৷

 



আইন প্রণয়ন

জাতীয় লোকসংখ্যা নীতি ২০০০(ন্যাশনাল পপুলেশন পলিসি ২০০০)-এর অন্তর্ভুক্ত লোকসংখ্যা সুস্থিত করার বিষয়টি অকুতোভয়ে ও কার্যকরীভাবে ফলপ্রসূ করার জন্য উপযুক্ত ও প্রণিধানযোগ্য আইন প্রনয়ণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ যদিও দুটি নির্দিষ্ট আইন আছে, যেগুলি বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রণীত, এগুলি হল :

মাতা-পিতার রোগনির্ণায়ক পদ্ধতি ১৯৯৪(দ্য পেরেন্টাল ডায়গোনস্টিক টেকনিকস্ 1994)(প্রবিধান ও প্রতিরোধ আইন):

এই আইনটি ১লা জানুয়ারী, ১৯৯৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে৷ এই আইনের শর্ত অনুযায়ী ভ্রুণের অসংগতি বা অস্বাভাবিকতা নির্ণয় করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে৷ ভ্রূণের লিঙ্গ প্রকাশ করা নিষেধ৷ এই আইন লঙ্ঘন করলে শাস্তি পেতে হবে৷

প্রসব-পূর্ববর্তী রোগ নির্ণায়ক পদ্ধতি(দ্য প্রি-ন্যাটাল ডায়গোনিস্টিকস টেকনিকস)(প্রবিধান ও অপব্যবহার প্রতিরোধ)আইন মেয়ে-ভ্রূণ হত্যা(যা প্রসবের পূর্বে লিঙ্গ নির্ণয়ের পরে হয়ে থাকে), যা সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর, সেটিকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে আইন প্রনয়ণের ক্ষেত্রে এক অগ্রগতিশীল আইন৷

চিকিত্সাশাস্ত্র-গত গর্ভপাত আইন(মেডিক্যাল টারমিনেশন অফ প্রেগনেন্সি অ্যাক্ট):

গর্ভপাতের সঙ্গে সংযুক্ত অসুস্থতা ও মৃত্যু প্রতিরোধ ও নিয়ণ্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে, ১৯৭১ সালে সংসদে চিকিত্সাশাস্ত্র-গত গর্ভপাত আইনটি পাস করা হয়, যেটি জম্মু ও কাশ্মীর ছাড়া(সেখানে আইনটি কার্যকর করা হয় ১৯৭৬-এর নভেম্বরে)সারা ভারতে ১৯৭২ সালের ১লা এপ্রিল থেকে কার্যকর করা হয়৷

চিকিত্সাশাস্ত্র-গত গর্ভপাত আইন, ১৯৭১-এ কোন অবস্থায় গর্ভপাত করা যাবে, কারা গর্ভপাত করতে পারবেন এবং কোন কোন জায়গায় গর্ভপাত করা যাবে, সেগুলি সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া আছে৷



এই আইনে নিম্নলিখিত শর্তগুলি উল্লিখিত আছে

মায়ের চিকিত্সাগত শারীরিক অবস্থা :

যখন মা কোনো শারীরিক বা মানসিক অসুখে ভুগছেন অথবা তাঁর গর্ভধারণে সমস্যা বা ঝুঁকি আছে, যার ফলে তাঁর জীবনহানি হতে পারে বা তাঁর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি হতে পারে৷
প্রজনন-গত কারণ: যখন গর্ভাবস্থায় ভাইরাস সংক্রমণ, ওষুধ খাওযা, এক্স-রে ও রঞ্জন রশ্মির সংস্পর্শে আসা, রক্তে কোনো দোষ, পাগলামি প্রভৃতির ফলে বাচ্চার গুরুতর শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্মানোর আশঙ্কা থাকে৷

মানবিক কারণ : যখন ধর্ষণের ফলে গর্ভাধান হয়৷

গর্ভাধান : পরিবার পরিকল্পনার উপায়গুলি ব্যবহার না করার ফলে গর্ভাধান৷ এই ধারা মহিলাদের অনুরোধে গর্ভপাত করানোর অনুমতি দেয়৷
সামাজিক-আর্থিক অবস্থা: যদি এই অবস্থা এমন হয় যে মায়ের শারীরিক ক্ষতি হবে৷ এটি আরেকটি ধারা, যেটিতে অনুরোধ মাফিক গর্ভপাতের বহু সুযোগ রয়েছে৷

এই আইন অনুযায়ী কেবলমাত্র ধাত্রীবিদ্যায় পারদর্শী অনুমোদিত নথিভুক্ত চিকিত্সকরাই গর্ভপাত করাতে পারবেন৷ যদি গর্ভাধানের সময়কাল ১২ সপ্তাহের কম হয়, তবে একজন চিকিত্সক অন্য কোনো চিকিত্সকের সঙ্গে পরামর্শ না করেই গর্ভপাত করাতে পারেন৷ কিন্তু যদি এই সময় ১২ সপ্তাহের বেশি হয়, তবে দু জন চিকিত্সক পরামর্শ করে গর্ভপাতের বিষয়টি বিবেচনা করবেন৷ যে কোনো একজন চিকিত্সক গর্ভপাত করাতে পারেন৷ যদি ২০ সপ্তাহ বা তার বেশি সময়ের গর্ভাবস্থা হয়, তবে একজন চিকিত্সক দ্বিতীয় কোনো চিকিত্সকের সঙ্গে পরামর্শ না করেই গর্ভপাত করাতে পারবেন, এমনকি কোনো অস্বীকৃত স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালেও৷

গর্ভপাত করানোর আগে মহিলাটির লিখিত সম্মতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরী৷ যদি মহিলাটি নাবালিকা হন বা শোকার্ত অবস্থায় থাকেন অথবা অপ্রকৃতিস্থ হন, তবে অভিভাবকের লিখিত সম্মতি নেওয়া আবশ্যিক৷ এমটিপি অ্যাক্ট ১৯৭১ অনুসারী গর্ভপাত একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাই পরিষেবা প্রদানকারীকে চরম গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে, রোগিণীর পরিচয় গোপন রাখতে হবে৷

সমস্ত সতর্কতা ও যথাযথ যত্ন নেবার পরেও যদি গর্ভপাতের ফলে কোনোরকম সমস্যার কারণ বা সমস্যা দেখা দেয়, তবে চিকিত্সকের বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না৷ কিন্তু যদি শর্তগুলি মানা না হয়, তবে সেরকম ক্ষেত্রে চিকিত্সকের অপরাধ শাস্তিযোগ্য, সঙ্গে ১০০০ টাকা জরিমানাও হতে পারে৷

চিকিত্সাগত ও প্রজননগত কারণে গর্ভপাত মা ও শিশু উভয়ের পক্ষেই মঙ্গলজনক, কিন্ত্ত এটিকে অবাঞ্ছিত সন্তান বা মেয়ে সন্তানের জন্ম প্রতিরোধের উপায় হিসাবে ব্যবহার করা অনৈতিক ও অসামাজিক, এটিকে কখনোই উত্সাহ দেওয়া উচিত নয়৷ বার বার গর্ভপাত মায়ের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর এবং এতে অসুস্থতা বা মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেক বেশি বেড়ে যায়৷মহিলাদের এগুলির ব্যাপারে বুঝিয়ে বলা ও জন্মনিরোধের অন্যান্য পদ্ধতিগুলি ব্যবহারে উত্সাহ দেওয়া উচিত৷

এই আইনটি(এমটিপি অ্যাক্ট)১৯৭৫ সালে সংশোধিত হয়৷ নিম্নলিখিত সংশোধনগুলি করা হয় :

  • মুখ্য জেলা চিকিত্সা আধিকারিককে গর্ভপাত করানোর আবশ্যক গুণাবলী শংসায়িত করার অধিকার দেওয়া হয়েছে৷ আগে এটি বো্র্ড-এর দ্বারা দেওয়া হত৷
  • গর্ভপাত করানোর প্রয়োজনীয় যোগ্যতা; ক)যদি নথিভুক্ত চিকিত্সক ২৫টি গর্ভপাতের ক্ষেত্রে সাহায্য করে থাকেন, খ)যদি চিকিত্সক ধাত্রীবিদ্যায় ৬মাস সহকারী চিকিত্সক হিসাবে থাকেন, গ)যদি ধাত্রীবিদ্যায় তাঁর স্নাতকোত্তর যোগ্যতা থাকে, ঘ)যদি চিকিত্সক ১৯৭১ আইন কার্যকর হবার আগে স্নাতক হয়ে থাকেন, তবে ধাত্রীবিদ্যায় ৩ বছরের অভিঞ্জতা, ঙ)আইন কার্যকর হবার পরে যাঁরা স্নাতক হয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ধাত্রীবিদ্যায় ১ বছরের অভিঞ্জতা
  • বেসরকারী সংস্থা(এনজিও)গুলিও মুখ্য জেলা চিকিত্সা আধিকারিকের কাছ থেকে অনুমতি(লাইসেন্স)নিয়ে গর্ভপাত করানোর পরিষেবা দিতে পারবে

এমটিপি অ্যাক্ট ১৯৭১(সংশোধন ১৯৭৫)আইন এবং এর অন্তর্গত পরিষেবাগুলির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকা ও উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা, এমনকি শহরাঞ্চলেও অদক্ষ এবং এই আইন অনুযায়ী অনুমোদিত নন, এমন ব্যক্তিরাও গর্ভপাত করিয়ে থাকেন৷

এর মূল কারণগুলি হল:
ক)গ্রামাঞ্চলে, প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে ও উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় সুরক্ষিত গর্ভপাত করনোর মত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অভাব, তাই সেখানকার মানুষ সঠিক পরিষেবা পান না, আর শহরাঞ্চলে পয়সার অভাবে মানুষ এরকম স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারেন না,

খ)সুরক্ষিত গর্ভপাত পরিষেবা সম্পর্কে তথ্যের অভাব,

গ)এমটিপি পরিষেবা দেবার জন্য সরকার পরিচালিত যে সব স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালগুলি আছে, সেখানকার অমনোযোগী পরিবেশ ও গোপনীয়তার অভাব

ঘ)অবিবাহিতা ও বিধবা মহিলাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে যাবার ব্যাপারে অনীহা



গর্ভপাত-পূর্ব সতর্কতা

গর্ভপাত-এর আগে প্রথমে সুনিশ্চিত হতে হবে যে মহিলাটির গর্ভপাত করানোর প্রয়োজন আছে, কি না৷ যদি থাকে, তো আন্দাজ করতে হবে যে গর্ভাধান কতদিন হয়েছে এবং গর্ভধারণ গর্ভাশয়েই হয়েছে কি না৷ সঠিক ভাবে করা হলে আবিষ্ট গর্ভপাতের ঝুঁকি সামান্যই, কিন্ত্ত গর্ভাবস্থা যত বেশিদিনের হবে, ঝুঁকি তত বেড়ে যাবে(গ্রিমস অ্যান্ড কাস্টস১৯৭৯)৷ অতএব, গর্ভপাতের সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি বেছে নেবার ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার সময়কাল চিহ্নিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷

 

প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মচারী থাকা উচিত, যাঁরা মহিলাটির আনুপূর্বিক বিবরণ নেবেন ও দ্বিহাস্তিক শ্রোণী পরীক্ষা(বাই ম্যানুয়াল পেলভিক এক্সামিনেশন)করবেন৷ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে আবিষ্ট গর্ভপাত করানোর মত কর্মচারী বা যন্ত্রপাতি না থাকলে মহিলাটিকে অবিলম্বে নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে৷ মহিলাটিকে সঠিক উপায় বেছে নেবার ব্যাপারে পরামর্শ দেবার মত দক্ষতা থাকতে হবে৷

শারীরিক পরীক্ষার সময় স্বাস্থ্য কর্মীকে দেখে নিতে হবে জরায়ু সামনের দিকে(অ্যান্টিভার্টেড)অথবা পেছনের দিকে(রিট্রোভার্টেড)ঝুলে আছে কি না,যার ফলে গর্ভাবস্থার সময়সীমা বুঝতে অসুবিধা হয়৷ এ ছাড়াও দেখে নেওয়া উচিত কোনোরকম সংক্রমণ ও জনন স্নায়ুপথের সংক্রমণ আছে কি না, যেগুলির জন্য অতিরিক্ত কোনো ব্যবস্থার প্রয়োজন বা চিকিত্সার জন্য অন্য হাসপাতালে পাঠানো প্রয়োজন৷ যেসব ক্ষেত্রে জরায়ু সংক্রান্ত সাংঘাতিক সমস্যা আছে, সেখানে মহিলাটিকে আরও পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য উপযুক্ত পরিষেবাদায়ী হাসপাতালে পাঠাতে হবে৷



আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানিং

প্রাথমিক স্তরে গর্ভপাতের প্রয়োজনে আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানিং(স্তরচিত্রণ)জরুরী নয়৷ যেখানে এই পরিষেবা উপলব্ধ, সেখানে গর্ভাধানের প্রায় ৬সপ্তাহ পর আল্ট্রাসাউন্ড করলে স্থানভ্রষ্ট গর্ভাধান নির্ণয়ে সুবিধা হয়৷ কোনো কোনো ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার দেরীতে গর্ভপাত করাতে হলে চিকিত্সক গর্ভপাত করানোর আগে ও করার সময় সুবিধার জন্য এই প্রযুক্তির সাহায্য নেন৷ যেখানে আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করানো হয়, সেখানে সম্ভব হলে প্রসব-পূর্ববর্তী সহিলাদের ও গর্ভপাতে ইচ্ছুক মহিলাদের স্ক্যানিং আলাদা আলাদা জায়গায় করা উচিত৷



পূর্বশর্ত

গর্ভাবস্থার সময়কাল আন্দাজ ও নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে, স্বাস্থ্যকর্মীদের উচিত মহিলাটির চিকিত্সা সংক্রান্ত পূর্বাপর বিবরণ নেওয়া ও গর্ভপাত করানোর সময় কাজে লাগবে এমন তথ্যগুলি বিবেচনা করা, মহিলাটি কি কি ওষুধ খাচ্ছেন, গর্ভপাত করানোর সময় ব্যবহৃত ওষুধের সঙ্গে সেগুলির কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হবে কিনা সে সম্পর্কেও তাঁদের জেনে নেওয়া ভাল৷ নিদানিক দিক থেকে একজন মহিলার গর্ভপাত করানোর সময় অন্যান্য চিকিত্সার মতই সতর্কতা নেওয়া প্রয়োজন৷ যদি জানা যায় যে মহিলাটি এইচআইভি আক্রান্ত, তবে তাঁকে আলাদাভাবে বিশেষ পরামর্শ দিতে হবে৷



জননীয় স্নায়ুপথের সংক্রমণ

গর্ভপাতের সময় নিম্ন জনন স্নায়ুপথে সংক্রমণ থাকলে, তা গর্ভপাতের পর বিপদের কারণ হতে পারে৷ দেখা গেছে যে সাধারণভাবে অ্যান্টিবায়োটিক(জীবাণু প্রতিষেধক)ব্যবহার করলে গর্ভপাত-পরবর্তী ঝুঁকি অর্ধেক কমে যায়৷ কিন্তু প্রতিরোধক হিসাবে ব্যবহারের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক না পাওয়া গেলেও গর্ভপাত করানো যায়, কেননা, এমনিতেই গর্ভপাত-পরবর্তী সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর কড়া নজর দেওয়া ও জীবাণুমুক্ত পদ্ধতি গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক৷
      যদি নিদানিক(ক্লিনিকাল)পরীক্ষায় মনে হয় যে সংক্রমণ আছে, তবে সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিত্সা শুরু করে পর্ভপাত করানো যেতে পারে৷ যে সব জায়গায় নিয়মিত ভাবে এই সংক্রমণের পরীক্ষা করা হয়, সেখানে পরীক্ষা করালেও, যদি আপাতভাবে সংক্রমণের লক্ষণ না থাকে, তবে রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা না করেই গর্ভপাত করানো যায়৷



স্থানভ্রষ্ট গর্ভাধান

স্থানভ্রষ্ট গর্ভাধান প্রাণঘাতী হতে পারে৷ গর্ভাধান জরায়ুতে না হয়ে অন্য কোথাও হয়েছে কিনা তা বোঝা যায় কয়েকটি লক্ষণ দেখে, যেমন, গর্ভাবস্থার সময়সীমা অনুযায়ী গর্ভাশয় বড় না হওয়া, তলপেটে ব্যথা, বিশেষত তার সঙ্গে যদি যোনির রক্তক্ষরণ বা অল্প রক্তস্রাব থাকে, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, ফ্যাকাশে ভাব এবং কিছু কিছু মহিলার ক্ষেত্রে উপাঙ্গীয় মাংসপিন্ড থাকা৷ স্থানভ্রষ্ট গর্ভাধান হয়েছে সন্দেহ হলে কোনরকম দেরি না করে সেটি চিহ্নিত করা ও চিকিত্সা শুরু করা উচিত বা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে এমন জায়গায় পাঠানো উচিত যেখানে আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা ও চিকিত্সার সুযোগ আছে৷

গর্ভাশয়ের কোষ পরীক্ষা :
যে সব মহিলা গর্ভপাত করাতে চান, তাঁদের ক্ষেত্রে গর্ভাশযের কোষ পরীক্ষার একটা সুযোগ থাকে, বিশেষত যখন গর্ভাশয়ের ক্যান্সার বা সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে৷ কিন্তু শুধু এটিই গর্ভপাত করানোর কোনো কারণ বা শর্ত হতে পারেনা এবং সুরক্ষিত গর্ভপাতের জন্য এই পরীক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই৷

তথ্য ও পরামর্শ :

সঠিক তথ্য দেওয়া গর্ভপাত পরিষেবার ক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজনীয়৷ তথ্য সম্পূর্ণ, যথাযথ ও সহজে বোধগম্য হতে হবে এবং তা মহিলাটির গোপনীয়তার অধিকারকে যেন কখনোই ক্ষুণ্ন না করে৷

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ :

গর্ভপাত করানোর ক্ষেত্রে বিকল্পগুলি বেছে নেবার ব্যাপারে মহিলাটিকে পরামর্শ দেওয়া খুবই গুরুত্বপর্ণ৷ তিনি যেন কোনরকম চাপে পড়ে সিদ্ধান্ত না নেন, তা-ও সুনিশ্চিত করা উচিত৷ পরামর্শদাতাকে হতে হবে প্রশিক্ষিত, তাঁকে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পরামর্শ দিতে হবে৷

যদি মহিলাটি গর্ভপাত করানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে স্বাস্থ্যকর্মীকে তাঁর কাছে এর আইনি দিকগুলি বুঝিয়ে বলতে হবে৷মহিলাটি সিদ্ধান্ত নেবার জন্য যতটা সময় চান, তাঁকে তা দিতে হবে, তাতে যদি তিনি পরে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তা-ও৷ যদিও তাড়াতাড়ি গর্ভপাত করানোর বৃহত্তর সুরক্ষা-কার্যকারিতার ব্যাপারটি তাঁকে বুঝিয়ে বলতে হবে৷

যাঁরা পর্ভাবস্থা জারি রেখে শিশুর জন্ম দিতে চান বা দত্তক নিতে চান, স্বাস্থ্যকর্মীদের উচিত তাঁদের সমস্ত তথ্য দেওয়া, এমনকি সঠিক জায়গায় পাঠানো বা সন্ধান দেওয়াও এর মধ্যে পড়ে৷
কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামী বা পরিবারের সদস্যরা মহিলাটিকে গর্ভপাত করানোর জন্য চাপ দেন৷ অবিবাহিতা কিশোরী ও এইচআইভি সংক্রামিত মহিলাদের ওপর বিশেষ করে চাপ সৃষ্টি করা হয়৷ এইচআইভি সংক্রমণ হয়েছে জানা গেলে সেই মহিলাকে তাঁর নিজের স্বাস্থ্যের জন্য ও শিশুর দেহে এই ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কার কারণে গর্ভধারণের ঝুঁকির কথা জানানো প্রয়োজন৷ তাঁরা কি কি চিকিত্সার সুযোগ পেতে পারেন ও শিশুর শরীরে সংক্রমণ কিভাবে এড়ানো যেতে পারে, সে সম্পর্কে সমস্ত তথ্য জেনে স্বইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নেবেন যে গর্ভাবস্থা জারী রাখবেন, অথবা আইনসম্মতভাবে গর্ভপাত করাবেন৷ তাঁরা আরও তথ্য জানতে বা পরামর্শ চাইতে পারেন৷ যদি স্বাস্থ্যকর্মীরা সন্দেহ করেন যে মহিলাটি ধর্ষিতা বা অত্যাচারিতা হয়েছেন, তবে তাঁরা তাঁকে আরও অন্যান্য পরামর্শ ও চিকিত্সার জন্য পাঠাবেন৷ প্রবন্ধককে নিশ্চিত করতে হবে যে সব কর্মচারীর কাছে যেন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক পরিষেবা সম্পর্কে সমস্ত তথ্য থাকে৷



গর্ভপাতের পদ্ধতি সম্পর্কিত তথ্য

গর্ভপাতে ইচ্ছুক একজন মহিলাকে অন্তত নীচের তথ্যগুলি দিতেই হবে:

১. গর্ভপাত করানোর আগের ও পরের পদ্ধতি
২. তাঁর কি কি অসুবিধা হতে পারে(যেমন, মাসিক রজঃস্রাবের মত খিঁচুনি, ব্যথা ও রক্তক্ষরণ)
৩. গর্ভপাত করাতে কতক্ষণ সময় লাগবে
৪. ব্যথা কমানোর জন্য কি কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে
৫. পদ্ধতির সঙ্গে জড়িত ঝুঁকি ও জটিলতা
৬. কখন তিনি স্বাভাবিক কাজকর্ম ও যৌনসংসর্গ করতে পারবেন, এবং
৭. পরবর্তী শুশ্রূষা

স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে যে, যদি গর্ভপাত পদ্ধতির বিকল্প বেছে নেবার সুযোগ থাকে, তবে গর্ভাবস্থার সময়কাল, মহিলাটির শারীরিক অবস্থা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির ভিত্তিতে কোন ব্যবস্থাটি উপযুক্ত, সে বিষয়ে মহিলাটিকে যেন তাঁরা পরিষ্কার তথ্য দেন৷

গর্ভনিরোধ সংক্রান্ত তথ্য ও পরিষেবা :

গর্ভনিরোধ সম্পর্কিত তথ্য ও পরিষেবার ব্যবস্থা রাখা গর্ভপাত-সুরক্ষার ক্ষেত্রে খুবই জরুরি, কেননা তার সাহায্যেই মহিলাটি ভবিষ্যতে অবাঞ্ছিত গর্ভাধান থেকে রক্ষা পাবেন৷
প্রত্যেক মহিলাকে জানানো উচিত যে গর্ভপাতের প্রায় দুসপ্তাহ পর থেকেই আবার ডিম্বক্ষরণ(ওভিউলেশন)শুরু হয়, সেক্ষেত্রে গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার না করলে আবার তাঁর গর্ভাধানের ঝুঁকি থেকে যাবে৷ তাঁর প্রয়োজন অনুসারে সঠিক পদ্ধতিটি বেছে নিতে সাহায্য করার জন্য তাঁকে যথাযথ তথ্য দিতে হবে৷যদি গর্ভনিরোধক পদ্ধতি কাজ না করার ফলে মহিলাটির গর্ভাধান হয়ে থাকে, তবে গর্ভনিরোধক পদ্ধতি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, না হলে সেটি ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি কি, অথবা সেই পদ্ধতির বদলে মহিলাটির অন্য কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত কিনা, এইসব ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের আলোচনা করা ও তাঁকে পরামর্শ দেওয়া উচিত৷ কিন্ত্ত শেষ পর্যন্ত মহিলাটির পছন্দই হবে শেষ কথা৷



গর্ভপাত সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ন্ত্রণ

সঠিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি যখন গর্ভপাত করান, তখন কোনো জটিলতা হয় না বললেই চলে৷ তবুও, স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরে প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা উচিত, যাঁরা গর্ভপাত সংক্রান্ত জটিলতাগুলি নির্ণয় ও সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সার ব্যবস্থা করতে এবং প্রয়োজনে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে পারবেন৷ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে আবিষ্ট গর্ভপাতের ক্ষেত্রেও স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভপাত সংক্রান্ত জটিলতার মতই নির্ণয়, নিয়ন্ত্রণ ও চিকিত্সার ও ২৪ ঘন্টা পরিষেবা(বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯৪)দেবার ব্যবস্থা থাকা উচিত৷

অসম্পূর্ণ গর্ভপাত :

দক্ষ চিকিত্সক যখন ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশনের(আবিষ্ট গর্ভপাতের একটি পদ্ধতি)সাহায্যে গর্ভপাত করান, তখন সাধারণত অসম্পূর্ণ গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে৷ এটি অন্যান্য নিদানিক পদ্ধতির ক্ষেত্রেই বেশি দেখা যায়৷ এর উপসর্গগুলির মধ্যে আছে যোনির রক্তক্ষরণ, পেটে ব্যথা ও সংক্রমণের লক্ষণ৷ প্রত্যেক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকা উচিত যাতে তাঁরা ভ্যাকুযাম অ্যাসপিরেশনের সাহায্যে জরায়ু আবার পরিষ্কার করে(রি-ইভ্যাকুয়েট)গর্ভপাত সম্পূর্ণ করতে পারেন৷ রক্তক্ষরণ বা সংক্রমণের সম্ভাবনার দিকেও নজর রাখা উচিত৷

অসফল গর্ভপাত :

অস্ত্রোপচার বা নিদানিক পদ্ধতি, এই দুই ক্ষেত্রেই অসফল গর্ভপাত হতে পারে৷ এরকম ক্ষেত্রে মহিলাটি যদি গর্ভপাতের পর দেখাতে আসেন এবং দেখা যায় যে তখনও তাঁর গর্ভাবস্থা থেকে গেছে, তবে ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশনের সাহায্যে তাঁর গর্ভপাত করানো উচিত৷ গর্ভাবস্থা ৩মাস পার হয়ে গেলে ডি অ্যান্ড সি(D&C)পদ্ধতিতে গর্ভপাত করাতে  হবে৷



রক্তক্ষরণ(হেমারেজ)

ভ্রূণের কিছু অংশ জরায়ুতে থেকে গেলে, জরায়ু আঘাতপ্রাপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হলে এবং অল্প ক্ষেত্রে জরায়ুতে ছিদ্র থাকলে রক্তক্ষরণ(হেমারেজ)হতে পারে৷ সেক্ষেত্রে, কারণের ওপর নির্ভর করে প্রয়োজন অনুসারে যথাযথ চিকিত্সা করা উচিত৷ যেমন, জরায়ু আবার পরিষ্কার(রি-ইভ্যাকুয়েট)করা ও রক্তপাত বন্ধ করার জন্য জরায়ু-সংকোচক ওষুধ দেওয়া, শিরার মাধ্যমে তরল দেওয়া ও গুরুতর অবস্থার ক্ষেত্রে রক্ত দেওয়া, ল্যাপরোস্কোপি বা ল্যাপরোটপি করা৷ প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রক্তক্ষরণ হচ্ছে এমন মহিলার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিত্সা শুরু করার বা অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকা উচিত৷

সংক্রমণ :

যথাযথ পদ্ধতিতে সুরক্ষিত গর্ভপাত করালে সংক্রমণের সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে৷ সংক্রমণের সাধারণ লক্ষণগুলি হল জ্বর বা কাঁপুনি, গর্ভাশয় বা যোনি থেকে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব নিঃসরণ, পেটে বা কোমরে ব্যথা, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা রক্তস্রাব, জরায়ুর স্পর্শকাতরতা, এবং/ অথবা রক্তে শ্বেতকণিকার মাত্রা বেড়ে যাওয়া৷ সংক্রমণ নির্ণীত হলে স্বাস্থ্যকর্মীদের উচিত তখনই অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া৷ গর্ভনিরোধক কোনো জিনিস বেশিদিন গর্ভে থাকার ফলে সংক্রমণ হয়েছে এমন মনে হলে গর্ভাশয় আবার পরিষ্কার(রি-ইভ্যাকুয়েট)করা দরকার৷ গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি করা আবশ্যক৷ আগেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেখা গেছে, প্রতিরোধক ডোজ-এ অ্যান্টিবায়োটিক দিলে গর্ভপাত-পরবর্তী সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়, অতএব, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে তা দেওয়া উচিত৷

জরায়ুতে ছিদ্র :

সাধারণত, জরায়ুতে ছিদ্র থাকলে তা ধরা যায় না এবং কোনো চিকিত্সা ছাড়াই সেরে যায়৷ গর্ভাবস্থার প্রথম তিনমাসের মধ্যে গর্ভপাত করাতে আসা ৭০০-রও বেশি মহিলার ওপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনের জরায়ুতে হওয়া ছিদ্র এত ছোট যে ল্যাপরোস্কোপি না করলে তা জানাই যেত না৷ ল্যাপরোস্কোপি হল নির্ণায়ক পদ্ধতি৷ ল্যাপরোস্কোপি পরীক্ষায় যদি ধরা পড়ে অন্ত্র, রক্তনালী বা অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে ল্যাপরোটমি করে তা ঠিক করা হয়৷
অবেদন(অ্যানাস্থেশিয়া)-সংক্রান্ত জটিলতা :

গর্ভাধানের প্রথম তিনমাসের মধ্যে গর্ভপাতের জন্য ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশন ও তিনমাসের পর গর্ভপাতের জন্য প্রসারণ ও পরিষ্কার, উভয় ক্ষেত্রেই সাধারণ অবেদন(অসাড়, অঞ্জান করা)-এর তুলনায় স্থানিক অবেদন(বিশেষ জায়গাটি অসাড় করা)বেশি সুরক্ষিত৷
সাধারণ অবেদনের ক্ষেত্রে খিঁচুনি ও হৃদযন্ত্র এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেবার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হতে হবে৷  মাদক পূর্বানুবৃত্তি জাতীয় ওষুধ হাতের কাছে মজুত রাখতে হবে৷



গর্ভপাত-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদী অবস্থা

যথাযথভাবে আবিষ্ট গর্ভপাত ঘটানো হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মহিলাদের সাধারণ শারীরিক ও জননীয় স্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রভাব পড়ে না৷ খুব অল্প ক্ষেত্রেই গর্ভপাত করানোর পর সাংঘাতিক জটিলতা সৃষ্টি হয়৷

গবেষণায় দেখা গেছে যে গর্ভাধানের প্রথম তিনমাসের মধ্যে সুরক্ষিতভাবে আবিষ্ট গর্ভপাত করালে পরবর্তী গর্ভাধানের ক্ষেত্রে তা কোনভাবেই প্রভাব ফেলে না৷ এপিডেমিয়োলজির তথ্য অনুসারে দেখা গেছে যে গর্ভপাতের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকির কোনো যোগ নেই৷ গর্ভপাতের পর মহিলারা আগের মতই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন৷



গর্ভপাত-পরবর্তী শুশ্রূষার নির্দেশ

গর্ভপাত করানোর পর হাসপাতাল থেকে বাড়ি যাবার পর কিভাবে নিজের দেখাশুনা ও সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত এবং অবিলম্বে চিকিত্সা করার মত কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা কিভাবে বোঝা যাবে, কি কি ব্যবস্থা নিতে হবে, সে সম্পর্কে মহিলাটিকে খুব পরিষ্কার ও সহজ ভাষায় মৌখিক ও লিখিত নির্দেশ দিতে হবে৷ গর্ভপাত করানোর পরে মহিলাটি যাতে প্রয়োজনে চিকিত্সকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, যা যা জানতে চান জানতে পারেন ও সাহায্য পান, তার ব্যবস্থা থাকা উচিত৷



বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ

পর্যবেক্ষণে যদি দেখা যায় যে কিছু স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানকারী বা সম্ভাব্য প্রদানকারী গর্ভপাতকে, এমনকি, যেখানে অনুরোধে গর্ভপাত আইনসিদ্ধ, সেখানেও নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন, তবে যোজনা পরিকল্পনাকারীদের উচিত যোগ্য মহিলারা যেন এই পরিষেবা পান, তা সুনিশ্চিত করা৷

জাতীয় নীতি ও মান নির্ণয় :

আইনসম্মত গর্ভপাতের ক্ষেত্রে যাতে উন্নতমানের পরিষেবা পাওয়া যায়, সে বিষয়ে নীতি এবং মান নির্ণয় ও কার্যকরী করা সুনিশ্চিত হওয়া উচিত৷ আধা-সরকারী, সরকারী ও বেসরকারী সংস্থাগুলিতে উন্নতমানের সুরক্ষিত গর্ভপাত পরিষেবা দেওয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন এগুলি চূড়ান্তভাবে সংযোজিত হয়-

  1. গর্ভপাতের বিভিন্ন পরিষেবা-পদ্ধতি ও সেগুলি কোথায় কোথায় পাওয়া যাবে,
  2. প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সরবরাহ, ওষুধপত্র ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা,
  3. দরকার পড়লে অন্য হাসপাতালে পাঠানো
  4. মহিলাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া--সিদ্ধান্ত, স্বাধীনতা, গোপনীয়তা, কিশোরীদের প্রয়োজনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া
  5. ধর্ষিতা মহিলাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা

গর্ভপাতের বিভিন্ন পরিষেবা ও সেগুলি দেওয়া যেতে পারে :

যোগ্য মহিলাদের গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে গর্ভপাত করানোর পরিষেবা দেবার প্রাথমিক ক্ষেত্রগুলিতে প্রভূত উন্নতি করা সম্ভব৷ এরকম গর্ভপাত করানোর জন্য ও  দরকার মত উপযুক্ত চিকিত্সার কারণে অন্য জায়গায় পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও যথাযথ যন্ত্রপাতি এবং সরবরাহের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ যেসব জায়গায় প্রাথমিক স্তরে সঠিক মানের পরিষেবা দেবার ব্যবস্থা নেই, সেখানে মহিলাটিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বড় হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা থাকা দরকার৷



সামাজিক স্তর

সমাজ-ভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মীরা মহিলাদের অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব রোধ, গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ও অসুরক্ষিত গর্ভপাত-এর বিষয়গুলি সম্বন্ধে পরামর্শ দেবার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন৷ অকারণে দেরি না করে সুরক্ষিত ও আইনসম্মত গর্ভপাত করানোর ব্যাপারে মহিলাদের পরানর্শ দেওয়া ও অসুরক্ষিত গর্ভপাতের ফলে দেখা দেওয়া জটিলতা ও হাসপাতালে পাঠানোর ক্ষেত্রেও তাঁদের সাহায্য করা উচিত৷

প্রাথমিক শুশ্রূষার সুবিধা-স্তর :

প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে সাধারণত মূল চিকিত্সার ব্যবস্থা থাকে ও কিছু প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী থাকেন৷ এখানে ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশন ও নিদানিক পদ্ধতিতে গর্ভপাত করানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে, কেননা এতে রাতে হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন পড়ে না৷



জাতীয় নীতি ও মান কার্যকরী করা

কর্মচারীদের মধ্যে নার্স, ধাই, স্বাস্থ্যসহকারী ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে চিকিত্সক থাকবেন৷ যেসব স্বাস্থ্যকর্মী ইতিমধ্যেই গর্ভাবস্থার লক্ষণগুলি বোঝার জন্য দ্বিহাস্তিক শ্রোণী পরীক্ষা ও আইডিইউ পদ্ধতি ব্যবহারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, তাঁদের ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশনের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে৷ যেখানে পর্ভপাতের নিদানিক পদ্ধতিগুলি নথিভুক্ত ও উপলব্ধ, সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরাও ভ্যাকুয়াম অ্যাসপিরেশন-এর প্রয়োগ ও দেখাশুনা করতে পারেন৷
স্বাভাবিক প্রসব ও স্বতঃস্ফূর্ত গর্ভপাতের মতই আবিষ্ট গর্ভপাতের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনে অবিলম্বে চিকিত্সার জন্য বড় হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা থাকা উচিত৷ এর জন্য প্রয়োজনে যে কোনো সময় যোগাযোগ করা যেতে পারে, এমন প্রশিক্ষিত কর্মী থাকা আবশ্যক৷

জেলা হাসপাতাল(যেখানে প্রথমে পাঠানো হয়)স্তর :

জেলা স্তরের হাসপাতালগুলিতে গর্ভপাতের প্রাথমিক-শুশ্রূষা স্তরের সমস্ত পরিষেবাগুলিরই ব্যবস্থা থাকা উচিত, এমনকি, যেখানে এই সুবিধাগুলি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আছে, সেখানেও৷ গর্ভপাত করানোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাগুলির প্রয়োজন খুব কম হয়, তাই স্বাভাবিক অবস্থায় গর্ভপাতের ক্ষেত্রে বিশেষ উপাদানগুলি ব্যবহার করা উচিত নয়, বিশেষত যেখানে ব্যয়সংকোচ প্রয়োজন৷ বিশেষ যন্ত্রপাতি বা পরীক্ষা, যেমন, প্রাথমিক অবস্থায় গর্ভপাতের ক্ষেত্রে ব্যয়সাধ্য আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানিং-এর কোনো প্রয়োজন নেই৷ এরকম গর্ভপাতের জন্য সাধারণ অবেদন(জেনারেল অ্যানাস্থেশিয়া)ব্যবহার করারও কোনো দরকার নেই, কেননা, এটি পদ্ধতির ঝুঁকি ও ব্যয় দুইই বাড়ায়৷ হাসপাতালগুলির বহির্বিভাগে গর্ভপাত পরিষেবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, এটি সুরক্ষিত, খরচ কম ও মহিলাদের যাতাযাতের পক্ষে সুবিধাজনকও বটে৷



দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের হাসপাতাল(যেখানে পাঠানো যেতে পারে)

দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলিতে আইনসম্মতভাবে গর্ভপাতের সমস্ত পদ্ধতিগুলির পরিষেবা দেবার উদ্দেশ্যে ও অসুরক্ষিত গর্ভপাতের জটিলতার মোকাবিলা করার জন্য যথোপযুক্ত কর্মী থাকা বাঞ্ছিত৷ বিশেষত, ভবিষ্যত চিকিত্সকদের গর্ভপাত করানোর ব্যাপারে সঠিক শিক্ষা ও দক্ষতা- প্রশিক্ষণের জন্য স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে এই পরিষেবা থাকা খুবই দরকার৷






Powered by Plone CMS, the Open Source Content Management System

This site conforms to the following standards: