ঋতুস্রাব
ঋতুস্রাব
ঋতুস্রাব হচ্ছে রক্তপাতসহ জরায়ুর পর্দা
(এন্ডোমেট্রিয়াম) খসে যাওয়া। একজন মহিলার সংজনন সময়কালে, গর্ভাবস্থার সময়
ছাড়া, মাসিক আবর্তে এটা হয়। ঋতুস্রাব শুরু হয় বয়ঃসন্ধিকালে (মেনার্চি-তে)
এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ হয় রজোনিবৃত্তির (মেনোপজের) সাথে।
-
|
ঋতুস্রাবের আবর্ত শুরু হয় রক্তপাত শুরু
হওয়ার প্রথম দিন থেকে, যেটাকে প্রথম দিন হিসাবে গণনা করা হয়।আবর্ত শেষ হয়
পরবর্তী আবর্তের ঠিক আগে। ঋতুস্রাব আবর্ত সাধারনত ২৫ থেকে ৩৬দিনের হয়।
কেবলমাত্র ১০ থেকে ১৫% মহিলার ঠিক ২৮ দিনের আবর্ত হয়। সাধারণতঃ এই
আবর্তগুলি সবচেয়ে বেশী পরিবর্তিত হয় এবং আবর্তগুলির মধ্যেকার বিরতি সবচেয়ে
বেশী হয় বয়ঃসন্ধির পরে এবং রজোনিবৃত্তির আগে।

ঋতুস্রাবের রক্তপাত চলে ৩ থেকে ৭ দিন, গড়ে ৫
দিন। একটি আবর্তে রক্তক্ষতি হয় সাধারণতঃ দেড় থেকে আড়াই আউন্স।ধরনের উপর
নির্ভর করে একটা স্যানিটরি প্যাড বা ট্যাম্পুন এক আউন্স রক্ত ধারন করতে
পারে। ঋতুস্রাবের রক্ত আঘাতের রক্তের মত জমাট বেধে যায় না, যদি না খুব
বেশী রক্তপাত হয়।
ঋতুস্রাবের আবর্ত হরমোন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত
হয়। লিউটেইনাইজিং হরমোন এবং ফলিকেল-সিমুলেটিং হরমোন, যেগুলি পিটুইটারি
গ্ল্যান্ড দ্বারা উত্পাদিত হয়, ডিম্ব উত্পাদন প্রবর্ধিত করে এবং
ডিম্বাশয়কে এস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরোন উত্পাদনে উদ্দীপিত করে। এস্ট্রোজেন
ও প্রজেস্টেরোন জরায়ু এবং স্তনকে উদ্দীপিত করে সম্ভাব্য উর্বরীকরণের জন্য
প্রস্তুত হতে।
|
|
-
|
চক্রটির তিনটি পর্ব আছে:
- ফলিকুলার(ডিম্বানু ছাড়ার আগে)
- ওভুলেটরি(ডিম্বানু ছাড়া)
- লিউটিয়েল(ডিম্বানু ছাড়ার পরে)
-
|
এই পর্বটি শুরু হয় ঋতুস্রাবের প্রথম
দিনে।কিন্তু এইপর্বের প্রধান বিষয় হচ্ছে ডিম্বাশয়ে বীজকোষের বৃদ্ধি।
ফলিকিউলার পর্বের প্রথমে জরায়ুর আভ্যন্তরিন আস্তরন পুরু হয় পুষ্টি এবং
তরল দ্বারা, ভ্রুণ এর পুষ্টির জন্য। যদি কোন ডিম্বানু উর্বরতাপ্রাপ্ত না
হয়ে থাকে, এস্টোজেন এবং প্রজেস্টেরোনের মাত্রা কম থাকে, ফলে
এন্ডোমেট্রিয়ামের উপরের পর্দাগুলি খসে যায় এবং রক্তপাত শুরু হয়। এই সময়ে
পিটুইটারি গ্ল্যান্ড বীজকোষ উদ্দীপক হরমোন উত্পাদনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।এই
হরমোন তখন ১০ থেকে ৩০টি বীজকোষের বৃদ্ধির সহায়ক হয়। এইপর্বের শেষদিকে যেমন
যেমন হরমোনের মাত্রা কমে এইসব বীজকোষের কেবল প্রভাবশালী একটি বাড়তে থাকে।
শীঘ্রই এটা এস্ট্রোজেন উত্পাদন শুরু করে এবং অন্য বীজকোষগুলি ভেঙে যেতে
শুরু করে। ফলিকুলার পর্ব গড়ে ১৩ থেকে ১৪ দিন থাকে। সবগুলোর মধ্যে এই
পর্বটা সবচাইতে বেশী কমবেশী হয়। মেনোপজের আগে এই পর্বটা সবচেয়ে ছোট হয়।এই
পর্বটা শেষ হয় যখন লিউটেনাইজিং হরমোন নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। এই ধাক্কার ফলে
ডিম্বানু ছাড়া বেড়ে যায় (ওভুলেশন)।
|
|
-
|
এই পর্বটা শুরু হয় যখন লিউটিনাইজিং হরমোন
হঠাত্ বেড়ে যায়। লিউটিনাইজিং হরমোন প্রভাবশালী বীজকোষটিকে জরায়ুর গা
থেকে ফুলে উঠতে উদ্দীপনা যোগায় এবং শেষ পর্যন্ত ফেটে গিয়ে ডিম্বানু ছাড়ে।
বীজকোষ উদ্দীপক হরমোন অল্প মাত্রায় বেড়ে যায়। বীজকোষ উদ্দীপক হরমোন বেড়ে
যাওয়ার কারন এখনও বোঝা যায় নি।
ওভুলেটরি পর্ব সাধারনতঃ ১৬ থেকে ৩২ ঘন্টা থাকে। ডিম ছাড়ার সাথে সাথে এটা
বন্ধ হয়ে যায়।
ডিম্বানু ছাড়ার ১২ থেকে ২৪ ঘন্টা পরে
লিউটিনাইজিং হরমোন বেড়ে যাওয়ার মাত্রা বোঝা যায় প্রস্রাবে হরমোনের মাত্রা
মেপে। এই মাত্রার পরিমাপ করে জানা যায় কখন মহিলা উর্বর। ছাড়ার ১২ ঘন্টার
মধ্যে একটা ডিম্বানু উর্বর হতে পারে। উর্বরতা প্রাপ্তির সবচেয়ে সম্ভাবনা
হয় যখন শুক্রানু আগে থেকেই সংজননপথে উপস্থিত থাকে।
ওভুলেশনের সময় অনেক মহিলা তলপেটের একদিকে একটা হালকা ব্যাথা অনুভব করে।
এই যন্ত্রনাকে আক্ষরিকভাবে মধ্য যন্ত্রনা বলে জানা যায়। যন্ত্রনাটা কয়েক
মিনিট থেকে কয়েক ঘন্টা থাকতে পারে। যন্ত্রনাটা বীজকোষ ভেঙে যাওয়ার আগে বা
পরে হতে পারে এবং সব ঋতুচক্রে না-ও হতে পারে। ডিম্বানু ছাড়ার কাজ দুটো
ডিম্বাশয় একের পর এক করে না, মনেহয় এলোমেলোভাবে করে। একটা ডিম্বাশয় বাদ
দিয়ে দেওয়া হলে, যেটা থাকে, প্রতি মাসে একটা করে ডিম্বানু ছাড়ে।
|
|
-
|
এই পর্বটা শুরু হয় ওভুলেশনের পরে। এটা প্রায়
১৪ দিন থাকে(যদি না উর্বরতাপ্রাপ্তি হয়ে যায়)এবং ঋতুস্রাব চক্রের পূর্বে
শেষ হয়। এই পর্বে ভেঙ্গে যাওয়া বীজকোষ ডিম্বানু ছেড়ে বন্ধ হয়ে যায় এবং
কর্পাস লিউটিয়াম নামে একটা অস্তিত্ব গঠন করে যেটা বেশী মাত্রায়
প্রজেস্টেরোন তৈরী করে। উর্বরতা প্রাপ্তি হলে প্রজেস্টেরোন গর্ভাধারকে
প্রস্তুত করে। প্রজেস্টেরোন দ্বারা উত্পাদিত কর্পাস লিউটেয়াম
এন্ডোমেট্রিয়ামকে ঘন করে। একটা সম্ভাব্য ভ্রুণকে পুষ্ট করার জন্য তরল ও
পুষ্টি ভরে। প্রজেস্টেরোন সারভিক্স এর মিউকাসকে ঘন করে যাতে স্পার্ম বা
ব্যাকটেরিয়ার গর্ভাধারে প্রবেশ করার সুযোগ কমে। প্রজেস্টেরোন শরীরের
তাপমাত্রা একটু বাড়ায় এবং সেটা বেড়েই থাকে যতক্ষণ না একটা স্রাবচক্র শুরু
হয়। এই বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রা ব্যবহার করে বোঝা যায় ওভুলেশন হয়েছে কী না।
লিউটাল পর্বের বেশীর ভাগ সময়েই এস্ট্রোজেনের মাত্রা বেশী থাকে। এস্ট্রোজেন
এন্ডোমেট্রিয়ামকে ঘন করতে উদ্দীপিত করে। এস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরোন এর
মাত্রা বাড়ার ফলে স্তনে দুধের পথগুলি বড় হয়ে যায়(ডিলেট)।তার ফলে স্তন ফুলে
যেতে এবং নরম হতে পারে।
যদি ডিম্বানু উর্বরতাপ্রাপ্ত না হয়, ১৪দিন
পরে কর্পাস লিউটেয়াম ভেঙ্গে যায় এবং একটা নতুন ঋতুচক্র আরম্ভ হয়। যদি
ডিম্বানু উর্বরতাপ্রাপ্ত হয়, বৃদ্ধিশীল এমব্রিও-র চারপাশের কোষগুলি
হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রোপিন নামক হরমোন উত্পাদন শুরু করে। এই হরমোন
কর্পাস লিউটেয়ামকে বজায় রাখে, যেটা প্রজেস্টেরোন উত্পাদন চালিয়ে যায়,
যতদিন না বৃদ্ধিশীল ভ্রুণ নিজের হরমোন তৈরী করতে পারে।গর্ভাবস্থা নির্ণয়ের
পরীক্ষাগুলি হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রোপিন এর মাত্রা বৃদ্ধির উপর
ভিত্তি করে হয়।
|
|
|
|