জলবায়ু পরিবর্তন : কৃষিতে এর প্রভাব
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বহুলাংশে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জোগান দিয়ে থাকে কৃষি। বিশ্বব্যাংকের সামপ্রতিক হিসাবে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষ কৃষি পেশায় নিয়োজিত আছেন। কিন্তু সামপ্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশের কৃষি বৈরী জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈরী জলবায়ুর সৃষ্টি হচ্ছে। পৃথিবীজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ও বনভূমি ধ্বংসের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। ফলে ঘটছে বিশ্ব উষ্ণায়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ এ বিশ্ব উষ্ণায়ন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি জলবায়ুর ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক অবস্থাকে অস্বাভাবিক ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষির ওপর। কেননা কোনো একটি নির্দিষ্ট কৃষির বেড়ে ওঠার জন্য একটি পরিমিত মানের জলবায়ুর তাপামাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি উপাদানগুলোর প্রয়োজন হয়। কৃষি জলবায়ুর উপাদানগুলোর ওপর যতটা সংবেদনশীল মানুষের অন্যান্য কর্মকাণ্ড বা পেশা ততটা সংবেদনশীল নয়।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ২০০০ সনে প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে কঙবাজার উপকূলে বছরে ৭.৮ মিমি. হারে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। গত চার দশকে ভোলাদ্বীপের প্রায় তিন হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২১০০ সন নাগাদ সাগর পৃষ্ঠ সর্বোচ্চ ১ মিটার উঁচু হতে পারে যার ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৮.৩ শতাংশ এলাকা নিমজ্জিত হতে পারে। এ পূর্বাভাস সত্যে পরিণত হলে বাংলাদেশকে উক্ত এলাকার কৃষিসহ সব কিছুকে হারাতে হবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম একটি নিদর্শন বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে যাওয়া। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে তেমন বৃষ্টি হয় না। আশ্বিন মাসে ৪-৫ দিন এমন পরিমাণে বৃষ্টিপাতে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ২০০৯ সনে বৃষ্টিপাত ২০০৮ সনের চেয়ে ৩২ শতাংশ কম হয়েছে। অথচ ২০০৯ সনের ২৭-২৮ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৩৩৩ মিমি. বৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২, ১৯৭৯, ১৯৮৯, ২০০৯ সনে দেশ খরার কবলে পতিত হয়। খরাসহ বিভিন্ন কারণে দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনে দিনে নিম্নমুখী হয়ে সেচকাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। এর ফলে বিভিন্ন কৃষির উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের বোরো ধান সেচের ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্র মতে, রাজশাহীর উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় ১৯৯১ সনে পানির স্তর ছিল ৪৮ ফুট, ২০০০ সনে তা নামে ৬২ ফুটে এবং ২০০৭ সনে নেমে যায় ৯৩.৩৪ ফুটে। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশে বন্যা হয়। স্বাভাবিক বন্যায় দেশের মোট আয়তনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং এরূপ বন্যা দেশের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও কৃষির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু জলবায়ু বৈরী হয়ে ওঠায় সামপ্রতিক দশকগুলোতে শুধু বন্যার সংখ্যাই বৃদ্ধি পায়নি, বন্যার তীব্রতাও বেড়ে গেছে। ১৯৭০ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত অন্তত ১২ বছর দেশ অস্বাভাবিক বন্যার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৮, ১৯৮৯ ও ২০০৪ সনের বন্যা ছিল প্রলয়ঙ্করী। ১৯৯৮ সনে সংঘটিত বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মারাত্মক বন্যায় দেশের মোট ভূভাগের প্রায় ৬৭ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
২০০৭ সনের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী সাইকোন সিডর আক্রমণ করার মাত্র দু’বছরের মধ্যে শক্তিশালী সাইকোন নার্গিস ও আইলা আঘাত হেনে দেশের কৃষিকে বিপর্যস্ত করে তোলে। সাইকোনের সাথে ধেয়ে আসা বড় বড় উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস দেশের নতুন নতুন এলাকায় মৃত্তিকার লবণাক্ততা সৃষ্টি করে চলেছে।
স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বিঘ্নিত হওয়ায় দেশটিকে ঘন ঘন বন্যা ও খরার সম্মুখীন হতে হয়। ১৯৭১ সনে বন্যা, ১৯৭২ সনে খরা আবার ১৯৭৪ সনে বন্যায় আক্রান্ত হয়। ১৯৭৭ ও ১৯৭৯ সনে খরার পর ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সনে বন্যা। মাঝখানে আবারো ১৯৮২ সনে খরা। এভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন বাংলাদেশের কৃষির জন্য অবধারিত নিয়তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৩-১৯৮৭ সন পর্যন্ত ২১.৮ লাখ মেট্রিক টন শুধু ধান নষ্ট হয়েছে খরায়। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা প্রভৃতি দেশের কৃষির ধরনকে বদলিয়ে দিয়েছে। এক সময় এ দেশে কয়েক হাজার প্রজাতির ধান চাষ হতো। বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় এক শ’তে দাঁড়িয়েছে। বন্যার কারণে আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষক সেচ ও খরচনির্ভর বোরো ধানের দিকে ঝুঁকেছে। অপর দিকে ধানের দিকে কৃষক বেশি ঝুঁকে পড়ায় ডাল চাষের জমি হ্রাস পেয়েছে। ফলে ডালশস্যের আবাদ তাৎপর্যপূর্ণভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়াও পাট, গম ও আখের চাষ উৎপাদন উভয়ই লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপজেলা আমতলীতে পাট, তামাক, গম ও স্থানীয় তেলবীজ তিল একেবারেই হারিয়ে গেছে। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপজেলা মনোহরপুরে তিসি, তরমুজ, তিল ও খেসারির স্থান দখল করেছে বোরো ধান। জলাবদ্ধতার কারণে আউশ ও আমন ধান ঐ অঞ্চল থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের উলিপুর উপজেলা হতে হারিয়ে গেছে স্থানীয় খাদ্যশস্য কাউন, গম ও পাট।
২০০৭ সনে দেশে দুই দফা বন্যা ও সাইকোন-সিডর হয়। এ কারণে দেশে প্রায় ২২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের ক্ষতি হয়। ২০০৮ সনের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি যখন দেশের ২৫টি জেলা বন্যাকবলিত তখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচণ্ড তাপদাহে মাটি শুকিয়ে যায়। ২০০৯ সনে দেখা দেয় খরা ও ঘূর্ণিঝড় আইলা। কৃষি উৎপাদন বিশেষজ্ঞগণের মতে এতে আমন ধান প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন কম উৎপাদিত হয়। প্রচণ্ড খরায় ২০০৯ সনে আমন ধান বিলম্বে ওঠার কারণে বোরো চাষাবাদ এক মাস পিছিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ২০১০ সনে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে বোরো বীজতলার অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে যায়। অনেক কৃষককে নতুন করে বোরো বীজতলা তৈরি করতে হয়। বৈরী জলবায়ুতে চারা সঙ্কট এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সরকারের চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (১.৯০ কোটি মেট্রিক টন) অর্জন ব্যাপকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিগত কয়েক বছরে উপর্যুপরি বৈরী জলবায়ুর কবলে পড়ে বাংলাদেশের কৃষি যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে তাতে এ আশঙ্কা দৃঢ়মূল হচ্ছে, ভবিষ্যতে দেশের কৃষি বৈরী জলবায়ুর সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০০৭ সনে ৬ এপ্রিল জাতিসংঘের Intergovernmental Panel On Climate Change (IPCC) এর ৪র্থ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সনে বিশ্বের ধানের উৎপাদন ৮ শতাংশ ও গমের উৎপাদন ৩২ শতাংশ হ্রাস পাবে। বাংলাদেশ এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি ও করণীয় নিয়ে সভা, আলোচনা, সেমিনার প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০০৯ সনের ৭ অক্টোবর ঢাকায় কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিশ্বখাদ্য সংস্থা আয়োজিত যৌথ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের কৃষি ও মৎস্য খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ কারণে ২০৫০ সন নাগাদ দেশে ফসলের উৎপাদন ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ২০০৯ সনের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত গবেষণা কর্মে গবেষক ড. জেড করিম আশঙ্কা ব্যক্ত করেন, প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশের কারণে বাংলাদেশে ১৯৯০ সনের তুলনায় ২০৭৫ সনে বোরো ধান উৎপাদন ৪ শতাংশ ও আলু উৎপাদন ৮.৭ শতাংশ কমে যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি পুনর্বদ্ধারে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যায় :
১. যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য যাতে অণ থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে,
২. বীজ কৃষির মূল (১১তম পৃষ্ঠায় দেখুন) উপকরণ। দেশের মাটি ও প্রতিবেশবান্ধব উচ্চফলনশীল বীজ উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষকের কাছে সহজলভ্যতা করতে হবে,
৩. দেশে বিদ্যমান ভূমি ও মৃত্তিকাসম্পদ ব্যবহার নির্দেশিকা কৃষিতে অনুসরণ এবং তা সময়ে সময়ে হালনাগাদ করতে হবে,
৪. দেশে যেসব প্রাকৃতিক জলাধার আছে সেগুলোকে বন্যার পানি ধরে রাখার কাজে ব্যবহার করতে হবে যাতে একদিকে বন্যার তীব্রতা হ্রাস পায় অপরদিকে অন্য ঋতুতে সেচের কাজে তা ব্যবহার করা যায়,
৫. আহাওয়া অধিদপ্তরকে আরো আধুনিকায়ন করে কৃষি জলবায়ু সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত কৃষককে প্রদান করতে হবে,
৬. মরুকরণ রোধে নদীর পানি প্রাপ্তির জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা করা,
৭. উর্বর ও তিন ফসলি জমির ওপর অকৃষি কর্মকাণ্ড বন্ধ করা,
৮. কৃষিবীমা ব্যবস্থা চালু করা,
৯. উচ্চ তাপমাত্রা ও বন্যা সহিষ্ণু জাত ও উদ্ভাবন করা,
১০. আধুনিক পদ্ধতিতে শস্য সংরক্ষণ করা,
১১. বিভিন্ন প্রকার পরিবেশ দূষণ হতে কৃষিজমিকে রৰা করা,
১২. উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষে উৎসাহিত ও সমপ্রসারণ করা।
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর জোরালোভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। বহুকষ্টে অর্জিত কৃষি ও মানব সভ্যতাকে যে কোনো মূল্যে টিকিয়ে রেখে পৃথিবীকে মানুষের বাসোপযোগী রাখা আজ বিশ্ববাসীর নৈতিক দায়িত্ব।
জলবায়ু পরিবর্তন : কৃষিতে এর প্রভাব
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বহুলাংশে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জোগান দিয়ে থাকে কৃষি। বিশ্বব্যাংকের সামপ্রতিক হিসাবে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের অবদান প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষ কৃষি পেশায় নিয়োজিত আছেন। কিন্তু সামপ্রতিক দশকগুলোতে বাংলাদেশের কৃষি বৈরী জলবায়ুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈরী জলবায়ুর সৃষ্টি হচ্ছে। পৃথিবীজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ও বনভূমি ধ্বংসের কারণে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। ফলে ঘটছে বিশ্ব উষ্ণায়ন। জলবায়ু পরিবর্তনের মূল কারণ এ বিশ্ব উষ্ণায়ন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি জলবায়ুর ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক অবস্থাকে অস্বাভাবিক ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষির ওপর। কেননা কোনো একটি নির্দিষ্ট কৃষির বেড়ে ওঠার জন্য একটি পরিমিত মানের জলবায়ুর তাপামাত্রা, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি উপাদানগুলোর প্রয়োজন হয়। কৃষি জলবায়ুর উপাদানগুলোর ওপর যতটা সংবেদনশীল মানুষের অন্যান্য কর্মকাণ্ড বা পেশা ততটা সংবেদনশীল নয়।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ইতোমধ্যেই বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ২০০০ সনে প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে কঙবাজার উপকূলে বছরে ৭.৮ মিমি. হারে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। গত চার দশকে ভোলাদ্বীপের প্রায় তিন হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২১০০ সন নাগাদ সাগর পৃষ্ঠ সর্বোচ্চ ১ মিটার উঁচু হতে পারে যার ফলে বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ১৮.৩ শতাংশ এলাকা নিমজ্জিত হতে পারে। এ পূর্বাভাস সত্যে পরিণত হলে বাংলাদেশকে উক্ত এলাকার কৃষিসহ সব কিছুকে হারাতে হবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম একটি নিদর্শন বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে যাওয়া। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে তেমন বৃষ্টি হয় না। আশ্বিন মাসে ৪-৫ দিন এমন পরিমাণে বৃষ্টিপাতে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ২০০৯ সনে বৃষ্টিপাত ২০০৮ সনের চেয়ে ৩২ শতাংশ কম হয়েছে। অথচ ২০০৯ সনের ২৭-২৮ জুলাই ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৩৩৩ মিমি. বৃষ্টি হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২, ১৯৭৯, ১৯৮৯, ২০০৯ সনে দেশ খরার কবলে পতিত হয়। খরাসহ বিভিন্ন কারণে দেশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিনে দিনে নিম্নমুখী হয়ে সেচকাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে। এর ফলে বিভিন্ন কৃষির উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের বোরো ধান সেচের ওপর প্রায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্র মতে, রাজশাহীর উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় ১৯৯১ সনে পানির স্তর ছিল ৪৮ ফুট, ২০০০ সনে তা নামে ৬২ ফুটে এবং ২০০৭ সনে নেমে যায় ৯৩.৩৪ ফুটে। ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশে বন্যা হয়। স্বাভাবিক বন্যায় দেশের মোট আয়তনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং এরূপ বন্যা দেশের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও কৃষির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু জলবায়ু বৈরী হয়ে ওঠায় সামপ্রতিক দশকগুলোতে শুধু বন্যার সংখ্যাই বৃদ্ধি পায়নি, বন্যার তীব্রতাও বেড়ে গেছে। ১৯৭০ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত অন্তত ১২ বছর দেশ অস্বাভাবিক বন্যার কবলে পড়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৮, ১৯৮৯ ও ২০০৪ সনের বন্যা ছিল প্রলয়ঙ্করী। ১৯৯৮ সনে সংঘটিত বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে মারাত্মক বন্যায় দেশের মোট ভূভাগের প্রায় ৬৭ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়।
২০০৭ সনের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী সাইকোন সিডর আক্রমণ করার মাত্র দু’বছরের মধ্যে শক্তিশালী সাইকোন নার্গিস ও আইলা আঘাত হেনে দেশের কৃষিকে বিপর্যস্ত করে তোলে। সাইকোনের সাথে ধেয়ে আসা বড় বড় উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস দেশের নতুন নতুন এলাকায় মৃত্তিকার লবণাক্ততা সৃষ্টি করে চলেছে।
স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বিঘ্নিত হওয়ায় দেশটিকে ঘন ঘন বন্যা ও খরার সম্মুখীন হতে হয়। ১৯৭১ সনে বন্যা, ১৯৭২ সনে খরা আবার ১৯৭৪ সনে বন্যায় আক্রান্ত হয়। ১৯৭৭ ও ১৯৭৯ সনে খরার পর ১৯৮০ ও ১৯৮৪ সনে বন্যা। মাঝখানে আবারো ১৯৮২ সনে খরা। এভাবেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন বাংলাদেশের কৃষির জন্য অবধারিত নিয়তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৭৩-১৯৮৭ সন পর্যন্ত ২১.৮ লাখ মেট্রিক টন শুধু ধান নষ্ট হয়েছে খরায়। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা প্রভৃতি দেশের কৃষির ধরনকে বদলিয়ে দিয়েছে। এক সময় এ দেশে কয়েক হাজার প্রজাতির ধান চাষ হতো। বর্তমানে এ সংখ্যা প্রায় এক শ’তে দাঁড়িয়েছে। বন্যার কারণে আউশ ও আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় কৃষক সেচ ও খরচনির্ভর বোরো ধানের দিকে ঝুঁকেছে। অপর দিকে ধানের দিকে কৃষক বেশি ঝুঁকে পড়ায় ডাল চাষের জমি হ্রাস পেয়েছে। ফলে ডালশস্যের আবাদ তাৎপর্যপূর্ণভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়াও পাট, গম ও আখের চাষ উৎপাদন উভয়ই লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপজেলা আমতলীতে পাট, তামাক, গম ও স্থানীয় তেলবীজ তিল একেবারেই হারিয়ে গেছে। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উপজেলা মনোহরপুরে তিসি, তরমুজ, তিল ও খেসারির স্থান দখল করেছে বোরো ধান। জলাবদ্ধতার কারণে আউশ ও আমন ধান ঐ অঞ্চল থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের উলিপুর উপজেলা হতে হারিয়ে গেছে স্থানীয় খাদ্যশস্য কাউন, গম ও পাট।
২০০৭ সনে দেশে দুই দফা বন্যা ও সাইকোন-সিডর হয়। এ কারণে দেশে প্রায় ২২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের ক্ষতি হয়। ২০০৮ সনের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি যখন দেশের ২৫টি জেলা বন্যাকবলিত তখন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রচণ্ড তাপদাহে মাটি শুকিয়ে যায়। ২০০৯ সনে দেখা দেয় খরা ও ঘূর্ণিঝড় আইলা। কৃষি উৎপাদন বিশেষজ্ঞগণের মতে এতে আমন ধান প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন কম উৎপাদিত হয়। প্রচণ্ড খরায় ২০০৯ সনে আমন ধান বিলম্বে ওঠার কারণে বোরো চাষাবাদ এক মাস পিছিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, ২০১০ সনে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে বোরো বীজতলার অধিকাংশ চারা নষ্ট হয়ে যায়। অনেক কৃষককে নতুন করে বোরো বীজতলা তৈরি করতে হয়। বৈরী জলবায়ুতে চারা সঙ্কট এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সরকারের চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (১.৯০ কোটি মেট্রিক টন) অর্জন ব্যাপকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিগত কয়েক বছরে উপর্যুপরি বৈরী জলবায়ুর কবলে পড়ে বাংলাদেশের কৃষি যেভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে তাতে এ আশঙ্কা দৃঢ়মূল হচ্ছে, ভবিষ্যতে দেশের কৃষি বৈরী জলবায়ুর সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০০৭ সনে ৬ এপ্রিল জাতিসংঘের Intergovernmental Panel On Climate Change (IPCC) এর ৪র্থ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদনে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সনে বিশ্বের ধানের উৎপাদন ৮ শতাংশ ও গমের উৎপাদন ৩২ শতাংশ হ্রাস পাবে। বাংলাদেশ এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি ও করণীয় নিয়ে সভা, আলোচনা, সেমিনার প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২০০৯ সনের ৭ অক্টোবর ঢাকায় কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিশ্বখাদ্য সংস্থা আয়োজিত যৌথ সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের কৃষি ও মৎস্য খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ কারণে ২০৫০ সন নাগাদ দেশে ফসলের উৎপাদন ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ২০০৯ সনের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত গবেষণা কর্মে গবেষক ড. জেড করিম আশঙ্কা ব্যক্ত করেন, প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশের কারণে বাংলাদেশে ১৯৯০ সনের তুলনায় ২০৭৫ সনে বোরো ধান উৎপাদন ৪ শতাংশ ও আলু উৎপাদন ৮.৭ শতাংশ কমে যাবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি পুনর্বদ্ধারে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যায় :
১. যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য যাতে অণ থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে,
২. বীজ কৃষির মূল (১১তম পৃষ্ঠায় দেখুন) উপকরণ। দেশের মাটি ও প্রতিবেশবান্ধব উচ্চফলনশীল বীজ উৎপাদন বাড়িয়ে কৃষকের কাছে সহজলভ্যতা করতে হবে,
৩. দেশে বিদ্যমান ভূমি ও মৃত্তিকাসম্পদ ব্যবহার নির্দেশিকা কৃষিতে অনুসরণ এবং তা সময়ে সময়ে হালনাগাদ করতে হবে,
৪. দেশে যেসব প্রাকৃতিক জলাধার আছে সেগুলোকে বন্যার পানি ধরে রাখার কাজে ব্যবহার করতে হবে যাতে একদিকে বন্যার তীব্রতা হ্রাস পায় অপরদিকে অন্য ঋতুতে সেচের কাজে তা ব্যবহার করা যায়,
৫. আহাওয়া অধিদপ্তরকে আরো আধুনিকায়ন করে কৃষি জলবায়ু সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত কৃষককে প্রদান করতে হবে,
৬. মরুকরণ রোধে নদীর পানি প্রাপ্তির জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা করা,
৭. উর্বর ও তিন ফসলি জমির ওপর অকৃষি কর্মকাণ্ড বন্ধ করা,
৮. কৃষিবীমা ব্যবস্থা চালু করা,
৯. উচ্চ তাপমাত্রা ও বন্যা সহিষ্ণু জাত ও উদ্ভাবন করা,
১০. আধুনিক পদ্ধতিতে শস্য সংরক্ষণ করা,
১১. বিভিন্ন প্রকার পরিবেশ দূষণ হতে কৃষিজমিকে রৰা করা,
১২. উপকূলীয় জেলাগুলোতে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষে উৎসাহিত ও সমপ্রসারণ করা।
পরিশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর জোরালোভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলো চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে। বহুকষ্টে অর্জিত কৃষি ও মানব সভ্যতাকে যে কোনো মূল্যে টিকিয়ে রেখে পৃথিবীকে মানুষের বাসোপযোগী রাখা আজ বিশ্ববাসীর নৈতিক দায়িত্ব।